বসন্তের ঠিকানা জয়চন্ডী পাহাড়-পুরুলিয়া

 

Credit and Writer – Subhrangsu Dasgupta

গতকাল একটা টিভি চ্যানেলে দেখলাম জয়চন্ডী পাহাড়ে আগুন লেগেছে, বহু গাছ নাকি পুড়ে গেছে। গত সপ্তাহে শুশুনিয়ার পর এবার জয়চন্ডী ! দেখে আরো বেশি করে খারাপ লাগল, কারণ লক ডাউনের ঠিক আগে আমার শেষ বেড়ানো ছিল এই জয়চন্ডী পাহাড়েই। আগুনের ছবি দেখতে দেখতে ঠিক এক মাস আগের জয়চন্ডী পাহাড়ের সুখ স্মৃতি উঁকি দিল মনের কোণে।

আমার মত হয়ত জয়চন্ডী পাহাড়ের সাথে অনেকেরই প্রথম পরিচয় টিভির পর্দায়, সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায়। মনে পড়ছে সেই দৃশ্যটা, যেখানে উদয়ন পন্ডিত একটি পাহাড়ের গুহায় লুকিয়েছিল হীরক রাজের প্রহরীদের থেকে পালিয়ে? আর সেইখানে উপস্থিত হল গুপী ও বাঘা। তারপর উভয় পক্ষের পরিচয় ও অত্যাচারী হীরক রাজাকে গদিচ্যুত করার পরিকল্পনা। হ্যাঁ সেই দৃশ্যটার শুটিং হয়েছিল পুরুলিয়ার এই পাহাড়েই।

এবার দোলের সময় পাড়ি দিয়েছিলাম পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার পলাশ-শিমুলময় বসন্তের প্রকৃতির আস্বাদনে। তখনও আতঙ্কের পরিস্থিতি গ্রাস করে নি মানুষকে। আসানসোল হয়ে বড়ন্তি-বিহারীনাথ-জয়চন্ডী পাহাড়। আস্তানা ছিল তিলুড়ী গ্রামে (আত্মীয়তা সূত্রে)। সফরের দ্বিতীয়দিন গাড়িতে রওনা দিলাম রাঢ় বাংলার দুই পাহাড়ের উদ্দেশে। বাঁকুড়া জেলায় বিহারীনাথ ও পুরুলিয়া জেলায় জয়চন্ডী। তিলুড়ী থেকে বিহারীনাথ মাত্র কুড়ি মিনিটের পথ। আশেপাশের অনেক গ্রাম থেকেই দেখা যায় বিহারীনাথের চূড়ো। যাবার পথে পড়ল পলাশ বন। প্রচুর পলাশ গাছ। ফুল ফুটতে শুরু করেছে গাছে গাছে। পাহাড়ের নিচে বেশ অনেকটা জুড়ে পলাশ বনে যেন লাল আবিরে প্রকৃতির হোলি খেলা। বাঁকুড়া জেলার সর্বোচ্চ পাহাড় বিহারীনাথ। পাহাড়ের নিচে রয়েছে শিব মন্দির।

এরপরের গন্তব্য জয়চন্ডী পাহাড় (Joychandi Hill)। শালতোড়া হয়ে বাঁকুড়া জেলা ছেড়ে প্রবেশ করলাম পুরুলিয়া জেলায়। রঘুনাথপুর গামী রাস্তার দুধারে থেকে থেকেই পলাশ গাছের ভিড় ও রক্তিমতার ছোঁয়া, গোটা পথ জুড়েই। রঘুনাথপুর শহরের কাছেই জয়চন্ডী। শহরে ঢোকার আগেই বাঁদিকে দেখা মিলল পাহাড়ের, দূর থেকে। এরপর শহর ছাড়িয়ে পৌঁছলাম পাহাড়ের পাদদেশে। প্রস্তরময় কয়েকটা ছোট বড় টিলা নিয়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। মালভূমির প্রকৃতি। পাহাড়ের নিচে একটি জলাশয়। চিনতে পারলাম, এটিই সেই ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় দেখানো পুকুর। বড় বড় প্রস্তরখন্ডে ভরা মূল পাহাড়িটিতে প্রায় ৫০০ সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় নজরে এল পাহাড়ের গায়ের জঙ্গলেও লাগতে শুরু করেছে লাল পলাশের রঙ। পাহাড়ের শিরে জয়চন্ডী দেবীর মন্দির। পাহাড়ের উপর থেকে চারিদিকে দূর্দান্ত ভিউ দেখে পাহাড়ের ওঠার কষ্ট এক লহমায় গায়েব হয়ে যায়। এই পাহাড়ে রক ক্লাইম্বিংয়ের প্রশিক্ষণ হয়। বিকেলবেলায় পাহাড়ের শিরে একটি বড় পাথরের উপর বসে রইলাম অনেকক্ষণ, নিচের পৃথিবীটার দিকে চেয়ে। আশেপাশে বড় বড় পাথরে ভরা কয়েকটা টিলা, নিচে সেই জলাশয়, একপাশে নিচে শস্য ক্ষেত ও রাঢ় বাংলার প্রকৃতি। দূরে অনুচ্চ পাহাড় শ্রেণীর হালকা রেখা। মন্দিরের পিছন দিকে নিচের উপত্যকার আবার আরেক রূপ। শেষ বিকেলে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য। পাহাড়ের উপর থেকে সামনের একটি টিলার মাথায় ও তারপর নিচের উপত্যকার দিগন্তে আকাশে রঙ ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্য। সূর্যাস্তের রূপ দেখে অভিভুত হলাম। সূর্য ডোবার পর পাথরের সিঁড়ি বেয়ে, পাহাড় থেকে নামার সময় জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে দেখি পূবাকাশে উদিত পূর্ণিমার চাঁদ। উদয়ন পন্ডিতের সেই গুহাটার খোঁজ পেলাম না। কিন্তু একটা সুন্দর বিকেল কাটিয়ে, জয়চন্ডী পাহাড়ের রূপ, জঙ্গলের ঘ্রাণ, সূর্যাস্তের মুহুর্ত – সব মিলিয়ে এক মুগ্ধতা নিয়ে ফিরেছিলাম সেদিন সন্ধ্যায়।

মনে পড়ল সেদিন পাহাড়ে ওঠার সিঁড়িতেই ‘পাহাড়-জঙ্গলে আগুন না লাগানোর’ প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কবার্তা দেখেছিলাম। বয়স্কদের কাছেও শুনেছিলাম যে একদল স্থানীয় দুস্কৃতির অনেকদিনের বদ অভ্যাস এই সময় পাহাড়ে আগুন লাগানোর। অনেক সময় তা

বাড়াবাড়ি হয়ে বড় আগুনে পরিণত হয়। প্রশাসনের তৎপরতায় অবশ্য কয়েকবছর আগুন লাগানোর ঘটনা বন্ধ ছিল। এবছর লক ডাউনের সুযোগে আবার কিছু কান্ডজ্ঞানহীন মানুষ জঙ্গলে এই আগুন লাগানোর কুকর্মটি চালিয়েছে, বেশ বোঝা যাচ্ছে। মানুষ কবে যে

সচেতন হবে, সে শহরের হোক বা গ্রামের। কবে বুঝবে প্রকৃতির ক্ষতি করলে বিপদে পড়বে যে নিজেরাই।

জয়চন্ডী পাহাড় যাবার সবচেয়ে সহজ উপায়, আদ্রা হয়ে। আদ্রা স্টেশন থেকে ৪ কিমি। আশা করি কয়েকমাস বাদে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বেড়াতে যাওয়া যাবে। জরুরী পরিসেবার সাথে যুক্ত না হলে, আপাতত সবাই নিজেদের কিছুদিন ঘর বন্দি করে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করুন
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial