পুরী ভ্রমণ by Sovik Sarkar

 

Credit and Writer – Sovik Sarkar

আশা করি সবাই সপরিবারে ভাল আছেন। এই দুঃসময়ে সময় কাটানোর একটা খুব ভাল পন্থা হল পুরোনো ভ্রমণ অভিজ্ঞতা রোমন্থন করা। তাই সেরকমই একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করতে এলাম।

এই গ্রুপে সবচেয়ে বেশী লেখালিখি যেসব জায়গা গুলো নিয়ে হয়েছে, পুরী সেই লিস্টে অনেকটাই উপরের দিকে থাকবে, আর সেটা স্বাভাবিক। পুরী আর বাঙ্গালী অবিচ্ছেদ্য। নতুন করে হয়ত আপনাদের বিশেষ কিছু জানার নেই, তবু এই লেখাটি যদি আপনাদের কোন উপকারে লাগে, খুব খুশি হব।

তাং- ১৭ই আগস্ট, ২০১৮

শুক্রবারের অফিস শেষে ঠিক সময়ে উপস্থিত হলাম শিয়ালদহ স্টেশনে, শিয়ালদহ পুরী দুরন্ত এক্সপ্রেসের উদ্দেশ্যে। ট্রেন ঠিক ৮টায় রওনা দিল, ট্রেনে ওঠা অবধি খাবার আসছে আর মুখ চলছে, খড়গপুরে টেকনিক্যাল স্টপ, রাত ১০টা নাগাদ গাড়ি থামল, তারপর কখন ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম নিজেও জানিনা।

তাং- ১৮ই আগস্ট, ২০১৮

ট্রেন প্রায় ১৫মিনিট before time এ পুরী পৌঁছে গেল, তখন ভোর ৪টে ১৫। ভাবলাম হোটেল অবধি গাড়ি পাবো কিনা এত ভোর বেলা, ওমা স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে দেখি মেলা গাড়ি আর auto র ভিড়। তার মধ্যেই একজন autowala দাদা কে ১০০টাকায় রাজি করিয়ে চলে গেলাম একদম চৈতন্য স্ট্যাচুর কাছে হোটেল Seagull এ। এর আগে অনেকবার পুরী গেছি, কিন্তু সমুদ্রের ধারে থাকার অভিজ্ঞতা ছিলনা, তাই আগের থেকে হোটেল seagull এর ফ্রন্ট sea facing রুম বুক করে রেখেছিলাম। যাইহোক, হোটেলের চেক ইন time এর অনেক আগে পৌঁছে যাওয়ার দরুন আমাদের রুম টা তক্ষুনি পেলাম না, তার বদলে আমাদের রিসেপশনেই লাগেজ রাখতে দিলেন ওনারা আর কমন বাথরুম ব্যবহার করতে দিলেন, হোটেল কর্মচারীদের ব্যবহার বেশ অমায়িক। আধ ঘন্টার মধ্যে দুজনে ফ্রেশ হয়ে এলাম, এসে শুনলাম যে আমাদের রুম সকাল ৯টার আগে ready হবেনা। তখন বাজে ৫টা, হাতে ৪ঘন্টা সময়, কি করি? ঘুম তো আসবেনা, তাই গিন্নির সাথে পরামর্শ করে ঠিক করলাম চিলিকা ঘুরে আসি। হোটেল থেকে বলল সবচেয়ে কাছের চিলিকা দেখার স্পট হল সত্পাড়া। যেতে আসতে দেড়-দেড় তিন ঘন্টা লাগবে। অগত্যা হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়ির খোঁজ করতে লাগলাম, এর মধ্যেই দেখলাম রক্তিম সমুদ্রের বুক চিড়ে সূর্য্য দেবতা উঁকি দিয়ে আমাদের পুরীতে স্বাগত জানাচ্ছেন।

প্রায় স্বর্গদ্বার অবধি হাঁটার পরেও একটাও গাড়ি না পেয়ে যখন বিষণ্ন বদনে ফিরে আসছি, হঠাৎ দেখলাম হোটেলের সামনেই একটা খালি diesel auto এসে দাঁড়াল, স্ট্যান্ড হবে হয়ত, প্রথমে এসে লাইন দেওয়ার মত ব্যাপার। গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম সত্পাড়া যাবে কিনা, দরাদরি করে ৮০০ টাকায় রাজি করলাম (গাড়িতে ১২০০-১৩০০ নেয়)। ব্যাস তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লাম চিলিকা লেক দেখার উদ্দেশ্যে।

আপনারা যাঁরা পুরী থেকে সত্পাড়া গেছেন নিশ্চই জানেন রাস্তার সৌন্দর্য অপরূপ। প্রথমে মেঠো গ্রাম আর সবুজ ক্ষেতের বুক চিড়ে রাস্তা চলে গেছে, একদম বিশুদ্ধ অক্সিজেন, আর অটো তে সেই হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, চিলিকা পৌঁছানোর প্রায় ১০কিমি আগের থেকে রাস্তার একদিকে চিলিকা কে সাথে নিয়ে যাবেন একদম শেষ অবধি। প্রায় সকাল ৭টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম সত্পাড়া চিলিকা ভিউ পয়েন্টে। এখান থেকে অনেকে ডলফিন দেখতে বোটিং করে থাকে, কিন্তু বোটিং করতে গেলে আরও দুঘন্টার ধাক্কা আর তাছাড়া তখন ট্যুরিস্টও নেই, নৌকা কখন ছাড়বে তার স্থিরতা নেই (আমার নিজস্ব মতামত, চিলিকা বোটিং টা রম্ভা থেকে করা better, ওখানে সৌন্দর্য বেশী আর ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম), তাই সে পথ না মাড়িয়ে, একটু ছবি তুললাম, দেখলাম সুবিস্তৃত জলরাশি নতুন সূর্য্যের আলোয় চিকচিক করছে, তার মধ্যে অনেক ভটভটি টাইপের নৌকা লোকাল লোকজন কে পার করে দিচ্ছে, এইসব দেখতে দেখতে, চা খেয়ে আবার ফেরার পথ ধরলাম। হোটেলের সামনে যখন পৌছালাম ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে ১০টা ছুঁয়েছে।

হোটেলটি বলাই বাহুল্য বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আমাদের ঘরটি বেশ বড়, এবং সামনে সমুদ্রের দিকে একটি সুবৃহৎ জানলা, পর্দা সরালেই সামনে সমুদ্র আর সৈকতে মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম।

স্নান টান সেরে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম শ্রী জগন্নাথ দেব দর্শনের জন্য। মন্দির দুপুর ১টা থেকে ৪টে অবধি বন্ধ থাকে, তাই চটপট একটা অটো করে চলে এলাম মন্দিরের দক্ষিন দুয়ারে, বড়জোর ১০মিনিট হোটেল থেকে। কোনো পান্ডা ছাড়াই ভগবান জগন্নাথ বলরাম শুভদ্রা দর্শন করে এবারে হেঁটে ফিরলাম স্বর্গদুয়ারের কাছে। তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় আড়াইটে। (প্রসঙ্গত বলে রাখি, মন্দিরের ধ্বজা উত্তোলন আগেই অনেকবার দেখার জন্য আর বিকেলবেলা মন্দিরমুখো হইনি, তবে আপনারা যাঁরা দেখেননি, অবশ্যই miss করবেন না, দেখার মত জিনিস) সামনেই বিখ্যাত “বিদেশ ঘর” থেকে lunch করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আরেকটু ঘুরে তারপর একবারে হোটেলে ঢুকব। সোজা গেলাম অটো স্ট্যান্ডে, আলাপ হল একজন বাঙালি অটো চালক দাদার সাথে, নাম হারাধন। ওনার সাথে প্রথমে গেলাম new marine drive এর পাশেই লাইট হাউসে। এখানে বিকেল সাড়ে ৪টে থেকে সাড়ে ৫টা অবধি ওঠার অনুমতি পাওয়া যায়। আমরা ১০টাকা করে টিকিট সংগ্রহ করে সিঁড়ি দিয়ে একদম উপরে চলে এলাম। এখান থেকে একদিকে সমুদ্র আরেকদিকে পুরী শহরের অনেকটা দেখা যায়, পড়ন্ত সূর্যের আলোয় সত্যিই দারুন লাগে। কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে আমরা আরও এগিয়ে চললাম মোহনার দিকে। মোহনা মানে যেখানে ধাউড়িয়া নদী বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ স্থান, সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে ছবি তুলে ফিরে আসার পথে দেখলাম একটি কালী মন্দির, আরতি হচ্ছে। মা এর আরতি দর্শন করিয়ে হারাধন দা সোজা নিয়ে এলেন আমাদের হোটেলের সামনে, সেদিনের মত তাঁকে বিদায় জানালাম এবং চলে এলাম রাতের সমুদ্র প্রত্যক্ষ করার জন্য। নিকষ কালো অন্ধকারে শ্বেতশুভ্র ফেনিল জলরাশি মনের মধ্যে অগাধ রহস্যের সঞ্চার করে, এই অভিজ্ঞতা পুরীর সমুদ্র ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া দুষ্কর। বেশ খানিক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে এলাম, সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ঘুম আসতে দেরী হলোনা।

তাং- ১৯শে আগস্ট, ২০১৮

পরেরদিন সকালবেলা হোটেলের জানলা থেকে সূর্যোদয় দেখলাম, তারপর জলখাবার আর স্নান সেরে একদম সাড়ে ৮টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম সেই হারাধন দার অটোতে। প্রথমেই যাব গুপ্তবৃন্দাবন।

হোটেল থেকে মোটামুটি ৪০মিনিটের পথ, পৌঁছে গেলাম গুপ্তবৃন্দাবনের প্রবেশ দ্বারে। এখানে গাড়ির পার্কিং চার্জ ১০টাকা লাগলেও কোন প্রবেশ মূল্য নেই, আপনি খুশি হয়ে যদি কিছু দান করেন সেটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার (যদিও এখন ৫টাকা করে টিকিট হয়েছে শোনা যায়)। স্থানীয়রা একে গৌড়বিহার আশ্রম ও বলে থাকেন। ওখানকার লোকমুখে শুনলাম, চৈতন্য চরিতামৃত অনুযায়ী শ্রী চৈতন্য যখন পুরীতে ছিলেন, এখানে প্রায়ই এই স্থানে আসতেন সাধনা করতে। ভিতরে ঢুকলেই আপনার মন কয়েকশো যুগ পিছনে চলে যাবে, বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর প্রতিরূপ দেখতে দেখতে, এখানে দেখতে পাবেন শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা কাহিনী মূর্তির আকারে বর্ণিত, শ্রী বিষ্ণুর দশাবতার এবং তার বিভিন্ন কাহিনী মডেল আকারে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে এবার চলে এলাম পাশেই তোতাপুরী আশ্রমে (১০-১৫মিনিট মাত্র)। এই আশ্রমটির স্থানীয় নাম অদ্বৈত ব্রহ্ম আশ্রম। এখানে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের গুরুদেব শ্রী তোতাপুরী মহারাজের মহাসমাধিস্থল, এই আশ্রমটির প্রবেশপথ খুবই চিত্তাকর্ষক, দুপাশে জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে তবে এখানে পৌঁছতে হয়, চারিদিক নির্জন পরিবেশ, মনটা হঠাৎ করে প্রশান্ত হয়ে যায়। চাইলে কিছুক্ষন বসে এখানে ধ্যান ও করে নিতে পারেন।

এরপর ওখান থেকে আরও ১৫মিনিটের পথ অতিক্রম করে পৌছালাম বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর (গোসাই বাবা) সমাধি মন্দির বা স্থানীয়দের মতে জটিয়া বাবার সমাধি মন্দির। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম আচার্য্য এবং কুসংস্কার মুক্ত নব-বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক। ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ, বেশ বড় জায়গা জুড়ে সমাধি মন্দিরটি পুরোটাই শ্বেতপাথরের। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

সেখানে কিছুক্ষন জিরিয়ে নিয়ে চললাম ঠিক রাস্তার উল্টোদিকে কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী আশ্রমের ভিতরে। কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ছিলেন একজন তান্ত্রিক সাধক, যিনি পরবর্তীকালে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ্যত্ম গ্রহণ করেন। এই আশ্রমের জায়গাটিও বেশ বড়, ভিতরে একটি সুবৃহৎ আশ্রম মন্দির, একটি পুকুর, আর একটি ওনার ব্যাবহৃত ফিটন গাড়ির মডেল আছে।

সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে এবার চললাম জগন্নাথ দেবের পিসির বাড়ি, প্রায় ২০মিনিটের পথ, নরেন্দ্র সরোবর নামক একটি জলাশয়ের মাঝে এই মন্দিরটি নির্মিত, জলের উপর ভাসমান পাটাতনের উপর দিয়ে ভিতরে গেলাম, মূর্তি দর্শন করলাম। প্রতি পদক্ষেপে এখানে পান্ডারা টাকা চাইবে, তাদের সবাইকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে এলাম।

এরপর আরও ১৫মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম বিখ্যাত মাসির বাড়িতে। এর স্থানীয় নাম গুন্ডিচা মন্দির। এখানে রথযাত্রার সময় রথ এসে থাকে। এখানেও সেই একই উৎপাত, কেউ হাত ধরে টানছে, কেউ জোর করে টিপ পরিয়ে দিয়ে টাকা চাইছে, কিন্তু এবার পন করে এসেছিলাম একজনও পান্ডার পাল্লায় পড়ব না, হলোও তাই, বহুকষ্টে তাদের উপেক্ষা করে এবং ওড়িয়া ভাষায় গালাগালি শুনে, মন্দিরের ভিতরের প্রতিটা কক্ষ প্রদক্ষিণ করে এলাম।

এরপর সোজা চলে এলাম পুরী স্টেশনের নিকটবর্তী সুদর্শন ক্রাফট মিউজিয়ামে। এখানে হরেক রকমের মূর্তি দেখা বা কেনার জন্য রাখা আছে, চাইলে এখানে থেকে কেনাকাটা করতেই পারেন, পকেট একটু কান্নাকাটি করতে পারে অবশ্য।

এবার দেখলাম ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ১২টার ঘরে, তাড়াতাড়ি lunch সেরে হোটেলে ফিরে এলাম। হারাধন দাকে সেদিনের মত বিদায় জানিয়ে প্রস্তুত হলাম হোটেল থেকে ঠিক করা গাড়ির উদ্দেশ্যে, এবার যাব ভুবনেশ্বর এর দিকে।

ঠিক দেড়টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম একটা swift গাড়ি করে, দেড় ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম উদয়গিরি তে। এখানে আছে মোটামুটি ১৮টি গুহা, যেগুলো মোটামুটি অক্ষত বলা চলে, সেখানে একটু ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম রাস্তার উল্টোদিকে খন্ডগিরি তে, এখানে মোটামুটি ১৫টি গুহা এবং প্রায় সবকটিই ক্ষয়প্রাপ্ত। টিকিট মূল্য ১৫টাকা প্রতিজন।

বেশী সময় ব্যয় না করে ওখান থেকে চলে গেলাম নন্দনকানন, বেশি সময় নেই হাতে, সোয়া ৪টে বেজে গেছে, আমরা ৫০টাকা করে প্রবেশ মূল্য দিয়ে ভিতরে আধ ঘন্টা মত একটু ঘুরলাম, দেখলাম হলুদ বাঘ, সিংহ, সাদা বাঘ, কুমির, হরিণ, বেবুন ইত্যাদি। সাফারি করার মত সময় ছিলনা। সাফারির জন্য পৃথক মূল্য দিতে হয়।

এরপর ফেরার পালা, পথে পড়ল সুবৃহৎ লিঙ্গরাজ মন্দির, ভিতরে যাওয়ার মত সময় না থাকায় বাইরে থেকেই প্রণাম করে এগিয়ে চললাম।

এবার পৌঁছে গেলাম ধবলগিরি বা ধৌলি তে। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে গেছে, দয়া নদীর তীরবর্তী শ্বেত শুভ্র বৌদ্ধ স্তূপটি সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধের একটি নিদর্শন। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে বিভিন্ন মুদ্রায় বৌদ্ধ মূর্তির নিদর্শন পাবেন, এছাড়াও এটি একটি সুন্দর ভিউপয়েন্ট ও বটে, উপর থেকে সবকিছু ছবির মত সুন্দর মনে হয়।

ঠিক সন্ধে ৬টায় ধবলগিরি বন্ধ হয়, আমরাও প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখেই বেরিয়ে এলাম, এবার গাড়ি করে হোটেল এ ফেরার পালা।

সারাদিনের ধকল সামাল দিতে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি।

তাং- ২০শে আগস্ট

পরেরদিন সকালবেলা সাড়ে ৭টায় বলা ছিল হারাধন দা কে, আমরা একটু early breakfast সেরে বেরিয়ে পড়লাম কোনার্কের দিকে।

পুরী থেকে ৪০কিমি পথ, আমরা পুরী কোনার্ক মেরিন ড্রাইভ ধরে এগোলাম, রাস্তাটি অপূর্ব, একধারে সমুদ্র, আবার কখনও ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, তার সাথে বৃষ্টি শুরু হল, সব মিলিয়ে দারুন প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করলাম। পৌনে দুঘন্টা পর যখন কোনার্ক পৌছালাম, তখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। ৪০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। দেখলাম মন্দিরের গায়ে খোদাই করা অসাধারণ কিছু শিল্পকর্ম, সেই বিখ্যাত চাকার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তোলা হল, এরপর মন্দিরের চারদিক টা একবার ঘুরে বেরিয়ে এলাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এখানে বিকালবেলায় একটা light n sound show হয়, যাঁরা বিকেলে যাবেন তারা উপভোগ করতে পারবেন।

এরপর হারাধন দা আমাদের নিয়ে এলেন চন্দ্রভাগা বীচে। কোনার্ক থেকে খুব দূরে নয়, ১৫মিনিটের পথ। পুরীর বীচের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা এবং পরিষ্কার, তবে স্নান করায় নিষেধাজ্ঞা আছে। কাছেই একটা দোকানে দুপুরের খাবার খেলাম, তারপর আবার সেই রাস্তা দিয়েই ফেরত চললাম পুরীর দিকে।

প্রায় আধঘন্টা ৪০মিনিট চলার পর, রাস্তার পাশেই রামচন্ডী মন্দির। এটির বয়স কোনার্কের সূর্য্যমন্দির থেকেও বেশী, একটি একটি অন্যতম শক্তিপীঠ। মন্দিরের ভিতরে ঢুকে বিগ্রহ দর্শন করে বেরিয়ে এলাম।

এরপর এগিয়ে চললাম পুরীর দিকে, কিছুদূর চলার পর রাস্তার ধারে দেখলাম একটি sand museum, আমার ধর্মপত্নীর অনুরোধে নেমে দেখতে হল, নাম “সুদাম স্যান্ড আর্ট গ্যালারি”, কি সুন্দর সুন্দর প্রতিকৃতি বানানো হয়েছে, মানুষ, পশু, পক্ষী , বাড়ি ঘর কি নেই সেখানে, না এলে সত্যি miss করতাম বলাই বাহুল্য।

কিছু সময় কাটিয়ে ছবি তুলে আমরা অবশেষে হোটেলে ফিরে এলাম।

হোটেল চেক আউটের সময় হয়ে গেছে, কিন্ত ট্রেন রাত ১০টার পর, এতক্ষন তো বাইরে থাকা যায়না, তাই চলে এলাম পাশের সোনালী হোটেল এ, একটু কমদামি ঘর নিলাম, শুধু মালপত্র গুলো রেখে এটুকু সময় যাতে নিশ্চিন্ত ভাবে সমুদ উপভোগ করা যায় সেইজন্য। আমাদের বহু কাঙ্খিত সমুদ্রস্নান সারলাম, তারপর হোটেলে ফিরে পোশাক বদলে বাকী সময় টুকু সমুদ্রের শোভা দেখেই কাটালাম, গিন্নি একটু নিজস্ব কেনাকাটা করলেন। আর খাজা তো আছেই, কিছুটা নৃসিংহ আর কিছুটা গাঙ্গুরাম থেকে প্যাক করে নিলাম।

এরপর হোটেল থেকে রাতের খাবার pack করে যথাসময়ে উপস্থিত হলাম পুরী স্টেশনে, রাত ১০টা১০এ পুরী হাওড়া এক্সপ্রেস ছেড়ে দিল।

তাং- ২১শে আগস্ট, ২০১৮

ভোরবেলা যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশন, একরাশ ভাললাগা সঙ্গে নিয়ে। এখনকার পুরী যত নোংরাই হোক, যত ভিড়ই হোক, যতই ঠকবাজ মানুষ বেড়ে যাক, ২-৩ বছরে একবার পুরী না গেলে সত্যিই সমুদ্র এবং জগন্নাথ দেব দুজনে মিলেই মন টাকে বড্ড টানে, কি বলুন? 🙂

কয়েকটি বিশেষ বিশেষ তথ্য:

১) আমাদের পুরী ভ্রমণ প্রতিদিনের হিসেবে সংক্ষেপে দিলাম,

প্রথমদিন

পুরী স্টেশন–> হোটেল–> চিলিকা(সত্পাড়া)–> হোটেল–> জগন্নাথ মন্দির–> লাইট হাউস–> মোহনা–>কালীবাড়ি–> রাতের সমুদ্র দর্শন–> হোটেল

দ্বিতীয়দিন

1st half by auto

হোটেল–> গুপ্তবৃন্দাবন–> তোতাপুরী আশ্রম–> বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী সমাধি মন্দির–> কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী আশ্রম–> পিসির বাড়ি –> মাসির বাড়ি –> সুদর্শন ক্রাফট মিউজিয়াম–> হোটেল

2nd half by car

হোটেল–> উদয়গিরি–> খন্ডগিরি–> নন্দনকানন–> লিঙ্গরাজ মন্দির–> ধবলগিরি–> হোটেল

তৃতীয়দিন

হোটেল–> কোনার্ক সূর্য্য মন্দির–> চন্দ্রভাগা বীচ–> রামচন্ডী মন্দির–> সুদাম স্যান্ড আর্ট গ্যালারি–> পুরী সমুদ্রস্নান–> হোটেল–> পুরী স্টেশন

২) পুরী যেতে গেলে সবচেয়ে ভাল ট্রেনে করে যাওয়া, হাওড়া থেকে বেশিরভাগ ট্রেন পাবেন, যেমন পুরী এক্সপ্রেস, জগন্নাথ এক্সপ্রেস, গরীব রথ, শতাব্দী ইত্যাদি, irctc দেখে নিন, কয়েকটি ট্রেন আছে যেগুলো শুধু কয়েকটি বিশেষ দিনে ছাড়ে, রোজ নয়।

শিয়ালদহ থেকে একমাত্র ট্রেন হল শিয়ালদহ পুরী দুরন্ত এক্সপ্রেস, যেটি সোম, বুধ, শুক্র চলে।

৩) যদি একান্তই ট্রেন এ বুকিং না পান তবে ধর্মতলা/বাবুঘাট থেকে পুরী বাস পাবেন। পুরীর বাস সীমিত সংখক হলেও, ভুবনেশ্বর যাওয়ার জন্য অনেক বাস available আছে ধর্মতলা থেকে। ভুবনেশ্বর পৌঁছে ওখান থেকে অনেক বাস/গাড়ি পাবেন পুরী যাওয়ার জন্য, মাত্র দেড় ঘন্টার রাস্তা।

বিস্তারিত জানার জন্য redbus app বা ধর্মতলা counter থেকে খোঁজ নিন, কারণ বাস এর timing মাঝে মধ্যেই পরিবর্তিত হয়।

৪) থাকার জন্য আপনার বাজেট উপযোগী অনেক option পাবেন, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই হোটেল বা হলিডে হোম। কোনটা ভাল কোনটা মন্দ এ ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত, তাই সবচেয়ে ভাল, গুগল করে দেখুন, রিভিউ পড়ুন এবং আপনার পছন্দের হোটেল ঠিক করুন। আমরা যে হোটেলগুলি তে ছিলাম সেগুলির ওয়েবসাইট দিলাম, সমস্ত ডিটেলস পেয়ে যাবেন।

Hotel Seagull

www.hotelseagull.in

Hotel Sonali

www.hotelsonali.com

৫) পান্ডা ছাড়া জগন্নাথ মন্দিরে অবশ্যই ঢোকা যাবে, হ্যাঁ প্রসাদ পেতে একটু পরিশ্রম করতে হবে, তবে চেষ্টা করলে ফল অবশ্যই পাবেন।

৬) খাজা সবার আলাদা আলাদা choice আছে, যেমন আমার হল নৃসিংহের বা গাঙ্গুরামের খাজা। মনে রাখবেন নৃসিংহ বলে অনেক গুলো দোকান আছে, স্বর্গদ্বার থেকে মন্দির যাওয়ার পথে যে নৃসিংহ sweets shop (খাজাপট্টি, বালিসাহি) আছে, সেটি আসল।

৭) পুরীর বীচে রাত ১০টার পর ঘোরাঘুরি না করাই ভাল, না ছিনতাই এর ভয় নেই, তবে sea facing রুম থাকার সুবাদে জানলা দিয়ে অনেক রাত অবধি তাকিয়ে দেখেছি অনেক মাতালের আড্ডা, টলমল করে হাঁটছে, কেউ নির্জন বীচের উপরেই প্রাকৃতিক কাজ সেরে নিচ্ছেন, আবার পুলিশের গাড়ি এলে সবাই vanish হয়ে যাচ্ছে নিমেষে। সিদ্ধান্ত আপনার।

৮) যাঁরা সামুদ্রিক মাছ খেতে ভালবাসেন তাঁদেরকে বলি যখন বীচের ধার থেকে ওই ঝুলিয়ে রাখা মাছ ভাজা বা কাঁকড়া কিনবেন, দয়া করে যাচাই করে নেবেন টাটকা কিনা, অনেক সময় ওরা বাসি মাছ ভেজে রেখে দেয়, ওদের বলবেন আগে খেয়ে দেখবো তারপর টাকা দেব, তাহলেই কাজ হবে।

৯) অটোচালক বাঙালি হারাধন দা আমাদের খুব ভাল করে ঘুরিয়েছেন, বাঙালি হলেও ওনারা কয়েক পুরুষ পুরী তে আছেন তাই সমস্ত জায়গা ওনার চেনা, আর তার ইতিহাস ও ঠোঁটোস্ত। যদি মনে হয় যোগাযোগ করতে পারেন 9861399407 এই নম্বরে। (দু বছর আগে গেছি, সুতরাং নম্বরটি এতদিনে যদি উনি change করে দিয়ে থাকেন, তবে ক্ষমাপ্রার্থী)

১০) আমাদের খরচ মোটামুটি হিসেব দিচ্ছি, (ট্রেন খরচ বাদে)

হোটেল বাবদ

(২৮০০x২দিন) মানে ৫৬০০, আর সোনালী হোটেল এ শেষদিন লেগেছিল ৬০০ টাকা (দরদাম করে)

অটো বাবদ

প্রথমদিন – ৮০০ টাকা (চিলিকা)

দ্বিতীয়দিন – ৯০০ টাকা (পুরীর আশেপাশে)

তৃতীয়দিন – ৮০০ টাকা (কোনার্ক)

স্টেশন থেকে হোটেল এবং হোটেল থেকে স্টেশন অটোভাড়া – (১০০x২) মানে ২০০ টাকা

গাড়ি বাবদ (ভুবনেশ্বর)

১৫০০ টাকা

খাওয়াদাওয়া বাবদ

Average – ৩০০ টাকা প্রতিজন/প্রতিদিন

১১) পুরী যেতে গেলে আগস্ট মাস বাদ দিয়ে আসুন, আগস্ট মাসে শ্রাবণ উৎসবের জন্য বাঁক কাঁধে নিয়ে অনেক মানুষ বাইরে থেকে আসেন, আর সেইজন্য খুব ভিড় হয় আর বীচ ও নোংরা করে রাখে।

১২) নন্দনকানন প্রতি সপ্তাহে সোমবার বন্ধ থাকে, সুতরাং সেইভাবে প্ল্যান করুন।

সবশেষে এটাই বলি, সবাই ঘুরুন আনন্দ করুন কিন্তু চেষ্টা করবেন আবর্জনা যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার, আমরা আমাদের প্রিয় পুরীকে প্রতিনিয়ত অপরিচ্ছন্ন করে ফেলছি, প্রশাসনও যথেষ্ট উদাসীন এ ব্যাপারে, এটাই চিন্তার বিষয়।

এই করোনা ভাইরাস সংকটের দিনে সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করুন
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial