জলদাপাড়ায় দু-দিন

 

Credits and Writer – Subhadra Nanda

দাদা জঙ্গলঘেরা সুন্দর দেখতে একটা কটেজ বুক করে রেখেছিল আগে থেকেই। নাম তার রাইনো কটেজ। ছবিতে দেখেছি, মাচার মত দেখতে বাড়ি গুলো। লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দোতলায় থাকার জায়গা। কটেজে পৌঁছলাম যখন প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে।

আমি আর মা ডুয়ার্সে এই প্রথম বার এলাম। এখানেও বেশ মেঘ মেঘ করে আছে। মনে হচ্ছে একটু পরেই বৃষ্টি নামল বলে। দাদা কটেজে পৌঁছেই বেরিয়ে গেলো জঙ্গল সাফারির ব্যাপারে খোঁজ নিতে। সাফারির মেইন গেট এখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। কাল যাবো সাফারিতে। মামা বলছে বৃষ্টি হলে পশু পাখিরা বাইরে আরোই বেরোবে না। লোকে বলে সাফারি তে গিয়ে জন্তু জানোয়ার দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অনেকেই পুরো দিন ঘুরে কিছুই না দেখতে পেয়ে ফিরে যায়। আমার তাও কেন জানি না মনে হলো, ট্রাভেলের দেবতা আমাদের প্রতি প্রসন্ন। চার দিন অলরেডী এত ভালো কাটিয়ে এসেছি, আর দুটো দিনই তো মাত্র বাকি ঘোরার। শেষে এসে কি আর উনি আমাদের নিরাশ করবেন।

কটেজ টা বরং ঘুরে দেখা যাক। জানোয়ারের দেখা পাই কি না পাই, জঙ্গল তো পেয়েই গেছি। তাই বা কম কিসে। ছবিতে যেমন দেখেছি তেমন, মাচার মত, লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতলায় থাকার জায়গা। কটেজের গেট পেরিয়ে গেলে ওপাশেই তোর্সা নদী বয়ে যাচ্ছে। নদীর ওদিকের তীরে জঙ্গল। ওই জঙ্গল থেকে নাকি পশুরা অনেক সময় জল খেতে আসে নদীতে। কটেজের কারা যেন গল্প করছিল শুনতে পেলাম, কাল খুব রাত্রে দুটো গন্ডার দেখা গেছে নদীর পাড়ে। একটা বড়ো গন্ডার আর একটা বাচ্চা গন্ডার। আমরা শুনেই খুব এক্সাইটেড। মনে আশা আজও যদি কিছু আসে। বলে রাখলাম, যত রাতই হোক, কোনো জন্তু যদি আসে তাহলে যেন আমাদের অতি অবশ্যই ডাকা হয়।

কটেজের বাগানে দোলনায় একটা দুষ্টু চোখের মিষ্টি বাচ্চা মেয়ে দুলছিল। আমাদের দেখেই চোখ নাচালো। ওর নাম ঝুমঝুমি। ওর বাবা মা এই কটেজের দেখাশোনা করে। আমার দাদার ছেলের সাথে ভারী ভাব হয়ে গেল ওর।

আমরা নদীর তীরে হাঁটতে বেরোলাম। নদীর পাড় ঘেঁষে সরু মাটির রাস্তা। ওখানের লোকজন দেখলাম খুব মিশুকে। রাস্তায় কারুর সাথে দেখা হলেই কোথায় থাকছি, কোথায় বাড়ি জানতে চায়। তারপর আমরা জঙ্গলে বেড়াতে এসেছি শুনে ওদের অভিজ্ঞতার কথা শোনায়। হাতির খুব উৎপাত ওখানে। কিছুদিন আগেই ওদের ধান নষ্ট করে গেছে। বাগান পুরো তছনছ করে দিয়ে গেছে। একজন তো বাইসন এর তাড়া খাওয়ার রোমহর্ষক কাহিনী ও শোনাল। বলে গেল বেশি দূরে না যেতে, আর সূর্য ডোবার আগেই ফিরে যেতে। আমরাও তাই বেশি বাড়াবাড়ি না করে আলো থাকতেই ফিরে এলাম। সাধ করে কে ই বা বাইসনের তাড়া খেতে চায়।

সন্ধে হতেই চারিদিকে গা ছমছমে মিশকালো অন্ধকার। ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এখন আকাশ দেখলাম অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে। তারা দেখা যাচ্ছে। কাল অব্দি ওয়েদার এরকম থাকলেই হয়।
ডিনারে ঝুমঝুমির মা খুব যত্ন করে খাবার পরিবেশন করলেন। ভদ্রমহিলার রান্নার হাত চমৎকার। এই দুদিন আমরা ভারী ভালো ভালো অন্য রকম রান্না খেয়েছি, যা শহরে সচরাচর পাইনা। পাট শাকের বড়া ভাজা, কি একটা লাল লাল ডাঁটার ঝাল ঝাল চচ্চড়ি, বাগান থেকে সদ্য তুলে আনা তরতাজা সবজির তরকারি, পুকুরের টাটকা মাছের ঝাল, বুনো মুরগির ঝোল, গন্ধলেবুর পাতা দিয়ে টমেটোর চাটনী, আরো কত কী। ভালো মতই পেট পুজো করে শান্তির ঘুম।

সকালে কিসব বন্য জন্তুর তাড়া টাড়া খেয়ে ঘুম থেকে ধর মড় করে উঠে গেলাম, মানে স্বপ্নে। ও, আজ বিকেলেই তো সাফারি। তার আগে অব্দি কোনো কাজ নেই, এই কটেজে বসে আরাম করো। এমনিও এই আরামের জীবনের মেয়াদ আজ শেষ হতে চলেছে। কাল আবার বাড়ি ফিরে গিয়ে সেই থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়। কটেজের বারান্দায় রাখা আরাম কেদারা়টার আজ বিকেল অব্দি মেম্বারশিপ নিয়ে নিয়েছি আমি। চুপটি করে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে বসে থাকো আর জঙ্গলের নিস্তব্ধতা উপলদ্ধি করো। গুন গুন করে একটু গান ও গাইতে পারো। মাঝে মাঝে দূরে নদীর তীরে চোখ চালিয়ে দেখ কোনো পশু টশু এলো নাকি জল খেতে। নাহ এলো না।

বিকেল হতেই আমরা হই হই করে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গল অভিযানে। দুঃখের বিষয় আবার আকাশ মেঘলা। অভয়ারণ্যের গেটে যখন ঢুকলাম তখন আবার টিপ টিপ শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের গাইড বললেন এই টিপ টিপ ওয়েদারেই জীব জন্তুর দেখা পাওয়ার বেশি চান্স। দেখাই যাক কী আছে কপালে, এই সব ভেবে টেবে আমরা জিপ এ চড়ে বসলাম। হুড খোলা জিপ দেখে আমার মা একটু সন্দিহান প্রকাশ করেছে। যদি জন্তু জানোয়ার গুলো আমাদের দেখে ছুটে আসে এদিকে? এই রকম খোলা জিপে করে জঙ্গলের ভেতরে যাওয়া ঠিক হচ্ছে? যাই হোক, অন্য রাও এভাবেই ঘুরছে এবং কারুর তো কিছু হয়নি এইসব বলে টলে আশ্বস্ত করা হলো।
জিপ স্টার্ট নিল। ঘন জঙ্গলের ভেতর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল জিপ। আর তার দশ মিনিটের মধ্যেই গাইড ফিস ফিস করে ড্রাইভার কে গাড়ি থামাতে বললো। কি হলো কি হলো? ওই যে একটু দূরে সবুজের ভেতরে মেটে রঙের কিছু একটা নড়েচড়ে উঠছে না? জিপ টা আস্তে করে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যেতেই বোঝা গেলো ব্যাপারটা। একটা গন্ডার এদিকে পেছন ফিরে ঘাসপাতা খাচ্ছে। ততক্ষনে আরো তিন চারটে জিপ আমাদের পেছনে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এবং কিছুজন গন্ডার দেখে মহা উত্তেজিত হয়ে হল্লা ও শুরু করে দিয়েছে। তাই বাবাজি কে আরো ভালো ভাবে দেখতে পাওয়ার আগেই বাবাজি গুটি গুটি পায়ে আরো ভেতরে চোখের আড়ালে চলে গেলেন। অল্প সময়ের জন্যে দেখা হলেও আমি মনে মনে ভারী খুশী। ঢোকার সাথেই সাথেই গন্ডার! আমরা নিশ্চয়ই আজ আরো অনেক কিছুই দেখতে পাবো। তারপর আরো খানিকক্ষণ এগিয়ে চললো জিপ, সামনে একটা ওয়াচ্ টাওয়ার দেখা যাচ্ছে আর তার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। জিপ ওখানে দাঁড় করানো হলো। কী ব্যাপার? সবাই জড়ো হয়ে কী দেখছে? ওহ্। তিনটে হাতি দুলকি চালে এগিয়ে আসছে দেখা যাচ্ছে। গাইড দাদা বলল সামনে সল্ট পিট এরিয়া। ওখানে নুন ছড়িয়ে রাখা থাকে আর পশুরা ওই নুন খেতে আসে দল বেঁধে। এই তিনটে হাতিও তবে নুন খেতে এসেছে। না না তিনটে নয়, পেছনে আরো একটা আসছে, চারটে! না না চারটে নয় পাঁচটা! আরে ওর পেছনে আরো দুটো! না তাও নয়! ওই দূরে দেখা যাচ্ছে আরো আরো অনেক আসছে এক এক করে! একদম ছোটো বাচ্চা থেকে শুরু করে মাঝারি, বড় সব সাইজের হাতি! বাচ্চা হাতি গুলো তাদের মায়ের পাশে পাশে, নিজেদের মধ্যে শুঁড়ে শুঁড় পাকিয়ে খেলা করছে। এই ভাবে গুনতে গুনতে আমরা সাতাশ আঠাশ অব্দি পৌঁছে গেলাম। পালের গোদা এলো সবার শেষে। তারপর ওরা বেশ খানিকক্ষন দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে নুন খেয়ে, আবার লাইন করে ফিরে গেলো। ড্রাইভার আর গাইডরাও দেখলাম এই পুরো দৃশ্যটির ভিডিও করতে ব্যাস্ত। বুঝলাম একসাথে এক জায়গায় এতগুলো হাতি হয়ত ওনারাও রোজ রোজ দেখেন না।

হাতিরা সব চলে যাবার পর আমরা আবার জিপে চড়ে বসলাম। আমাদের জিপ ছাড়া বাকি সব জিপ গুলোই ততক্ষনে চলে গেছে অন্যদিকে। মেঘের জন্য একটু অন্ধকার অন্ধকার ও লাগছে। আবার বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি আবার ব্রেক কষল। এবার কী? একটা বাইসন। এবং বেশ কাছেই। ঘাস খাচ্ছে। একটু পর কী মনে করে মুখ তুলে চাইল। তারপর আমাদের পাত্তা না দিয়ে আবার ঘাস খাওয়ায় মন দিল। সেই ভালো, বাইসন এর পাত্তা পাওয়া মোটেও ভালো কথা নয়। গাইড দাদা বলল এর আগে বাইসন এর জিপ উল্টে দেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো মোটেও বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়।

তারপর আমরা গেলাম হলং টুরিস্ট লজের সামনে। ওখানেও একটা সল্ট পিট রয়েছে। অনেক ময়ূরের দেখা পেলাম ওখানে। তারপর ওখান থেকে আরেক ওয়াচ্ টাওয়ার। আর ওখানে পৌঁছতেই বেশ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। দূরে একটা সম্বর হরিণকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে জঙ্গলের ভেতরে চলে যেতে দেখলাম। যা বৃষ্টি এখানে দাড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই। ভাগ্যিস এই জোরে জোরে বৃষ্টিটা দেরী করে শুরু হলো, আরেকটু আগে হলেই গিয়েছিলাম আর কি। যাই হোক, আমাদের আশা তো পূর্ণ হয়েছে। জঙ্গল ও দেখা হলো আর জানোয়ার ও। গন্ডার, হাতির দল, বাইসন, ময়ূর আর তারপর সম্বর হরিণ। বলেছিলাম না ট্রাভেলের দেবতা প্রসন্ন আছেন?
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। কাল সকালে উঠেই তো আবার যে যার নিজের গন্তব্যে, আবার আগের মত যে যার নির্ধারিত কাজে লেগে পড়া। এবং ফুরসৎ পেলেই ফোনে ফোনে পরের বারের প্ল্যান করা। তারপর আবার শুরু দিন গোনা, হৈ চৈ করে বেরিয়ে পড়া, তারপর কোনো নীল আকাশের নীচে সবুজ প্রকৃতির বুকে একটু প্রাণ ভোরে নিশ্বাস নিয়ে আবার ঘরে ফেরার পালা। এই চক্র যতদিন চলে চলতে থাকুক।

P.s : অনেক অনেক ফটো তুলেছিলাম ওখানে। তার মধ্যে বেছে বেছে কিছু দিলাম। জীব জন্তু ও পাখির ফটো গুলো দাদার ক্যামেরায় তোলা। বাকি গুলো সব আমার মোবাইল এর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করুন
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial